বিংশ
শতাব্দীর অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন জনপ্রিয় গায়ক এবং গিটারিস্টজর্জ হ্যারিসন । আজ তাঁর
২৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী্।সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একজন সহযোদ্ধা।
জগৎবিখ্যাত এই মানুষটি হলেন জর্জ হ্যারিসন।বাংলাদেশের পক্ষে গোটা বিশ্বকে করেছিলেন
জাগ্রত তিনি। গোটা দুনিয়ায় সাড়া জাগানো ‘দ্য বিটলস’ ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট এবং
অন্যতম কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৭১
সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নেওয়া একটি উদ্যোগই পৃথিবীর মানুষকে নাড়া দিয়েছিল
। সবাইকে জানিয়েছিলেন পাক হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষের ওপর কী নিপীড়ন আর হত্যাযজ্ঞই
না চালাচ্ছে। তুলে ধরেছিলেন প্রতিবেশী ভারতে শরণার্থী হওয়া কোটি মানুষের দুঃসহ বেদনার
কথাও।
আর সেটাও
তিনি করেছিলেন গানে গানেই। পৃথিবীর বুকে আয়োজন করেছিলেন সম্ভবত প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট।
সেই কনসার্টের ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে শত বছরের অন্যতম সেরা আয়োজনের তকমাও জুড়ে আছে
সাথে।
১৯৭১
সালের ১ আগস্ট, রোববার। ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি সেতার বাদক পণ্ডিত রবি শংকরের
অনুরোধে ব্রিটিশ সঙ্গীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন আয়োজন করেন এক ঐতিহাসিক কনসার্ট। যুক্তরাষ্ট্রের
নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এই ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বাংলাদেশের
ন্যায়সঙ্গত দাবিকে পৌঁছে দেয় বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে। কনসার্ট থেকে অর্জিত অর্থ
ইউনিসেফের মাধ্যমে ব্যয় করা হয় বাংলাদেশি শরণার্থীদের সহায়তায়।
আসরে
সঙ্গীত পরিবেশন করেন নোবেলজয়ী বব ডিলানসহ বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা। আরও উল্লেখযোগ্য হলো
জর্জ হ্যারিসনের লেখা, সুর করা ও গাওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি, যা সেদিন শ্রোতাদের মনে গভীর
দাগ কাটে। গানের শুরুতে ‘আমার বন্ধু এসেছিল’ এই ‘বন্ধু’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন রবি শংকরকে।
গানের প্রতিটি পংক্তিতে তিনি নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা আর বাংলাদেশের মানুষের পাশে
দাঁড়ানোর আন্তরিক আবেদনকে শক্তভাবে তুলে ধরেছিলেন।
জর্জ
হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ গানটি ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এ্যাঞ্জেলেসের
‘দ্য রেকর্ড প্লাট’ নামের বিখ্যাত স্টুডিওতে ধারণ করা হয়েছিল। ওই মাসেরই ২৮ তারিখ অর্থ্যাৎ
‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’র ঠিক তিন দিন আগে গানটি রিলিজ করা হয়। জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে
এই গানটির সহ প্রযোজক ছিলেন আমেরিকান বিখ্যাত প্রযোজক, সঙ্গীতশিল্পী ও গীতিকার হার্ভি
ফিলিপ স্পেক্টর।
গানটির মূল প্রযোজক ছিলেন ফিল স্পেক্টর। এর রেকর্ডিংয়ে সহায়তা করেন আমেরিকান সঙ্গীতশিল্পী লিয়ন রাসেল, স্যাক্সোফোন বাদক জিম হর্ন এবং ড্রামার জেমস লি কাল্টনার। পাশাপাশি সহায়তা করেছিলেন ব্রিটিশ সঙ্গীতশিল্পী এবং দ্য বিটলসের প্রাক্তন ড্রামার রিঙ্গো স্টারও।
‘বাংলাদেশ’
গানটি পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কোনো চ্যারিটি সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃত। সঙ্গীত ইতিহাসের
অন্যতম গভীর সামাজিক বক্তব্য হিসেবেও এটি পরিচিত। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব কফি
আনান গানটি সম্পর্কে বলেন, “গানটির হৃদয়গ্রাহী বার্তা বাংলাদেশের সংকটকে ব্যক্তিগতভাবে
মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।”
জর্জ
হ্যারিসন—বাংলাদেশের মহান বন্ধু—জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ইংল্যান্ডের
লিভারপুলে। সঙ্গীত তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়, যদিও জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে
কাটিয়েছেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ব্রিটিশ মডেল ও ফটোগ্রাফার প্যাট্রিসিয়া অ্যান বয়েডকে বিয়ে
করেন। এক যুগেরও বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবন শেষ হয় ১৯৭৭ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য
দিয়ে।
পরের বছর জর্জ হ্যারিসন আমেরিকান লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অলিভিয়া ত্রিনিদাদ হ্যারিসনকে বিয়ে করেন। ১৯৭৮ সালের ১ আগস্ট জন্ম হয় তাদের একমাত্র সন্তান ডানি হ্যারিসনের। মজার বিষয় তাদের সন্তান জন্মের তারিখটি ছিল দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশের বর্ষপূর্তির দিন।
জীবনের শেষ দিনগুলোয় রবি শংকরের সঙ্গে কিছু কাজ করছিলেন হ্যারিসন। তার মধ্যে ছিল ‘শান্টস অব ইন্ডিয়া’ অ্যালবামটি। ভারতীয় ক্লাসিক্যাল ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে এটির প্রযোজকও ছিলেন তিনি। সেটির প্রচারণার জন্যে ১৯৯৭ সালে জর্জ হ্যারিসন সবশেষ টেলিভিশনে পর্দায় এসেছিলেন। এর পরই গলায় ক্যান্সার ধরা গড়ে তার। তিনি রেডিওথেরাপি নিতে শুরু করেন।
এর মধ্যে
১৯৯৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডে ফ্রাইয়ার পার্কে তার বাড়িতে ঢুকে মানসিকভাবে অসুস্থ
এক ব্যক্তি জর্জ হ্যারিসন ও তার স্ত্রী অলিভিয়ার ওপর ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। এতে হ্যারিসনের
ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে একসময় তার ফুসফুসে ক্যান্সারও ধরা পড়ে। অবশেষে
২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর মাত্র ৫৮ বছর বয়ে মারা যান এই কিংবদন্তি।
জর্জ
হ্যারিসনের শেষ বিদায় হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে—ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে। তিনি
বেভারলি হিলসের হেদার রোডে পল ম্যাককার্টনির বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ভারতীয়
সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে হিন্দু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় তার দেহাবশেষ
দাহ করা হয়, যার একটি অংশ পরে ভারতের গঙ্গা ও যমুনা নদীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
জর্জ হ্যারিসন ছিলেন এমন এক মহৎ মানুষ, যাদের পরিচয় কোনো দেশ দিয়ে বাঁধা যায় না—মানবতাই তাদের আসল পরিচয়। সঙ্গীত দিয়ে তিনি বিশ্বকে নাড়া দিয়েছেন, আর মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা দেখিয়েছেন অনন্যভাবে। পৃথিবী তাকে চিরকাল শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে, তবে সবচেয়ে গভীর ভালোবাসায় তাকে মনে রাখবে বাংলাদেশের মানুষ। তিনি আমাদের সত্যিকারের বন্ধু, আমাদের পরমাত্মীয়। বিদায়ের এই দিনে তাকে জানাই অন্তরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।